মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পাবনা জেলার একটি উপজেলা আটঘরিয়া। ঐতিহাসিকদের মতে মহাভারত বিরোচিত পান্ডবভ্রাতাগণের রাজত্ব ছিল এই অঞ্চলে। কোন এক সময় পান্ডবগন পাবনার মাটিতে যজ্ঞ করেছিল। তখন থেকে এই অঞ্চলটি পাবনা নামে পরিচিত। পাবনার উত্তরে বৃহৎ চলন বিল যা চাটমোহরের দক্ষিণ সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিম-দক্ষিণে পদ্মা নদী এবং পূর্বদিকে যমুনা নদী প্রবাহিত ছিল। মোট কথা পাবনার প্রায় গোটা অঞ্চল ছিল জলমগ্ন। ভূ-প্রকৃতির গঠন হিসেবে তখন পাবনা মূল ভূ-খন্ডের অস্তিত্ব ছিল যে স্থানে তা ঈশ্বরদীর কিছু অংশসহ গোটা আটঘরিয়া যা পদ্মার শাখা চন্দ্রবতী নদীর পূর্বে অবস্থিত ছিল।

 

অতীতে পাবনা জেলায় চোর-ডাকাতের চরম উৎপাৎ করে বৃহৎ চলনবিল অঞ্চলের ডাকাতদল রত্নাই ও চন্দ্রাবতী নদী হয়ে দক্ষিণ অঞ্চলে অবাধে চলাফেরা করতো এবং প্রায়ই ডাকাতিতে লিপ্ত হোত।এলাকার জান-মাল রক্ষার্থে প্রথমে আটঘারিয়াতে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। পরবর্তীকালে আটঘরিয়া মৃত লালন সিংহের স্ত্রী মাতঙ্গিনী সিংহ ১১ বিঘা জমি দান করেছিল। উক্ত জমির উপরিই ১৩৩৪ সালে আটঘরিয়া থানা (পুলিশ স্টেশন) ভবন নির্মাণ হয়। পাবনা জেলা শহরের ১৩ কিঃমিঃ উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই আটঘরিয়া উপজেলা।

 

আটঘরিয়া উপজেলা পাবনা জেলার একটি ছোট উপজেলা। এর উত্তরে চাটমোহর,ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলা, দক্ষিন-পুর্বে সদর উপজেলা,পুর্ব দিকে সাঁথিয়া পশ্চিমে ঈশ্বরদী এবং নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলা অবস্থিত। এর আয়তন ৫:৯৩ বর্গ কি মি। লোকসংখ্যার ৫১:৪১% পুরুষ এবং ৪৮:৫৯% মহিলা। প্রাচীনকাল থেকে এ উপজেলায় বাগদি ও বুনো সম্প্রদায়ের লোক আছে তারা ধলেশ্বর ও খিদিরপুরে বসবাস করেন।

এ উপজেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক এবং খাদ্য উদ্ভৃত্ত উপজেলা। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৬% কৃষিজীবি। ধান ,পাট,ইক্ষু, কলাই,সরিষা,পেয়াজ, বেগুন,আলু,সীম, লাউ,নানা ধরনের শাক,আম,কাঠাল,কলা,লিচু প্রভৃতি জন্মে। এছাড়া অনেক হাস মুরগীর খামার,দুগ্ধ খামার গড়ে উঠেছে। এখানে তাত শিল্প ও আছে। প্রচুর মাছের খামার গড়ে উঠেছে। এসব খামারের মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উপজেলার বাইরেও যাচ্ছে যা চাষীদের অর্থের যোগান দিচ্ছে।আর একটি অর্থকারী ফসল হচ্ছে সীম।

 

 

ইতিহাসের পথপরিক্রমায় আটঘরিয়া

 

 

০১. ঐতিহ্যের হাত ধরে, মহাকালের মহাসড়কে ...

চন্দ্রাবতী, ইছামতি, রত্নাই, চিকনাই ও কমলা নদী - দিঘি, সানকিভাঙা, গজারিয়া, কৈডাঙি, খলসাবাড়ি, হোগলবাড়ি, আঠারো খাদা, কলমিগাড়ি, মধুগারি, চত্রা, জলকা, গুবিদ, গারুল প্রভৃতি বিলের জলধারা-স্নাত ; কৈবর্ত বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রাহ, সিপাহী বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলনের গৌরব-দীপ্ত ; বেরুয়ান, বংশীপাড়া যুদ্ধের গৌরবে মহিমান্বিত ; শিক্ষাবিদ ইদ্রিস আলী, সঙ্গীত-সাধক শহীদ এম এ গফুর, বরেণ্য আলেম মওলানা ইয়াকুব আলীর স্মৃতি-ধন্য ; বেরুয়ান জামে মসজিদ, খানবাড়ি মসজিদ, মৃধার মসজিদ, গোড়রী মন্দিরসহ নানা ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তিতে অনন্য আজকের আটঘরিয়া পাবনা জেলার এক সমৃদ্ধ উপজেলা। তথ্য-প্রযুক্তির ঐশ্বর্যের এই যুগে গুগলে সার্চ দিলেই চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় এর মানচিত্র, খুঁটিনাটি তথ্য ও ইতিহাস। শ্রীকোলের সুপ্রাচীন বটবৃক্ষ, সড়াবাড়িয়ার আকাশ-ছোঁয়া তালগাছ-জামগাছ, সারি সারি নারিকেল-সুপারি গাছ এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যের সোনালি দিনের সাক্ষ্য কার্পাস তুলার শুভ্রতা জানান দিচ্ছে আটঘরিয়ার পুরনো দিনের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে।

    আটঘরিয়ার উন্নতি-অগ্রগতির মূল নায়ক কৃষকদের উৎপাদিত ধান-পাট-শিম-পেঁয়াজ-রসুন-মরিচ ও বিচিত্র সব্জি এ-অঞ্চলকে করেছে বাংলাদেশের উন্নতি-অগ্রগতির দৃপ্ত পথিক। কবি বন্দে আলী মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, শহিদ আব্দুল খালেক উচ্চ বিদ্যালয়, শহিদ দারোগা আব্দুল জলিলের কবর, শহিদ আবুল কাশেমের কবর, বংশীপাড়া স্মৃতিসৌধ, গুচ্ছগ্রাম, আদর্শগ্রাম, নাটোরের রাণী ভবানীর দানকৃত দেবোত্তর সম্পত্তি, দিঘাপতিয়া জমিদারের স্মৃতি-স্মারক দিঘির বিল - সবই আটঘরিয়াকে গৌরবান্বিত করেছে। সমাজহিতৈষী ও  নাট্যপরিচালক-নির্দেশক ও ঔপন্যাসিক ড. জহির বিশ্বাস, ডিজিএফআই-এর সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) নজরুল ইসলাম রবি, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যাপক এ টি এম ফখরুল ইসলাম সুজা, মেরিন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শাহ আলম, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হাসানুজ্জামান বাবুল, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল কাদের, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিসংখ্যানবিদ জগাই-মাধাই, লোককবি আব্দুল মালেক সরকার, পুঁথি পাঠক আবু মুছা, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. লুৎফর রহমান, ডা. মনজুর কাদের, ডা. ওমর আলী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নকিবুল্লাহ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক উজ্জ্বল হোসেন,  বারডেম হাসাপাতালের খ্যাতিমান চিকিৎসক ডা. খাজা নাজিমুদ্দিন, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসিবুর রহমান সোহেল, মেজর ফিরোজ প্রমুখ আটঘরিয়ার সূর্যসন্তান।  

 

    নদী-বিল-জলাশয়ের জলধারায় সিক্ত, তরু-লতা-বৃক্ষরাজি শোভিত, ফুল-ফল-ফসলে ভরা আটঘরিয়া সত্যিই অতুলনীয়। এ-যেন স্রষ্টার অপার লীলামহিমায় সৃষ্ট এক অপূর্ব শিল্পকর্ম। জৈন-বৌদ্ধ-হিন্দু-বৈষ্ণব-ইসলাম-খ্রিস্টান কত ধর্মের মানুষের চিন্তাধারা যে এখানকার মানুষের প্রাণপ্রবাহে মিশেছে তার ইয়ত্তা নেই। গুপ্ত-পাল-সেন-পাঠান-মোগল-বৃটিশ বেনিয়া আর খান সেনাদের শাসন-দুঃশাসনের কত কীর্তি যে এই মাটিতে লীন হয়েছে তার সীমা-পরিসীমা নেই। এই মাটির ভাঁজে ভাঁজে লেগে আছে অগণিত মুক্তিকামী নর-নারীর ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। এই মাটিতে দাপিয়ে বেড়িয়েছে অমিততেজী মুক্তিসেনা, এখান থেকেই লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছে অত্যাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত-সুপ্রশিক্ষিত পাকসেনা। এখানকার আকাশে-বাতাসে কান পাতলে এখনও ভেসে আসে স্বাধিকার-প্রমত্ত মানুষের উদাত্ত কণ্ঠের ধ্বনি। অগণিত সাধু-সন্ন্যাসী, বাউল-বৈরাগী, অলি-আউলিয়া-পির-গাউস-কুতুবের পদচিহ্ন বুকে নিয়ে মহাকালের মহাসড়কে হেঁটে চলছে আটঘরিয়া। মৃধার মসজিদ, খানবাড়ি মসজিদ, বেরুয়ান জামে মসজিদ, একটি মাঠ ও অনেকগুলো দিঘি ও সারিবদ্ধ গাছপালা দেখে অনুমান করা হয় এ-অঞ্চল এক সময় অতীব গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ছিল।

  

০২. সাধারণ পরিচয় : আয়তন-সীমারেখা,

পাবনা সদরের ১৩ কি.মি উত্তর-পশ্চিমে পাবনা-চাটমোহর মহাসড়কের পূর্ব পাশে প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে আটঘরিয়ার অবস্থান। উত্তর পার্শ্বে রয়েছে চাটমোহর, ভাঙ্গুরা এবং ফরিদপুর উপজেলা ; দক্ষিণ পার্শ্বে  পাবনা সদর ও ঈশ্বরদী উপজেলা ; পূর্ব দিকে বেষ্টন করে আছে সাঁথিয়া উপজেলা ; পশ্চিম পার্শ্বে রয়েছে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলা। আয়তন ১৮৬.১৫ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা ১,৫৬,৫৯৪ জন (প্রায়), ৭৮,০৭৩ এবং মহিলা ৭৮,৫২১ জন (প্রায়) এবং নারীপুরুষের অনুপাত ১০০ঃ ৯৯। এখানে রয়েছে ১ টি পৌরসভা, ৫টি ইউনিয়ন, ৫টি পোস্টঅফিস, ২৯,৫৭৫টি খানা, ১১১টি মৌজা, ১৩০টি গ্রাম, ১টি সরকারি হাসপাতাল, ১৭টি ক্লিনিক ও স্বাস্থসেবা কেন্দ্র, ৫টি পোস্ট অফিস, ৩টি নদী, ১১টি হাট-বাজার, ৭টি ব্যাংকের শাখা, ৭টি কলেজ, ২টি সিনিয়র মাদ্রাসা, ১৫টি দাখিল মাদ্রাসা, ২০টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৪টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৪৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৯টি রেজি. প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৬১টি মসজিদ ও ১০টি এতিমখানা (সূত্র : বাংলাপিডিয়া, সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত, এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা)।

 

০৩. ইতিহাস : নিরবধি কাল ধায় অবিরাম ...

কাল অবিরাম গতিতে প্রবাহিত হয়। ইতিহাসের ভাঙা-গড়ায় সৃষ্টি হয় নানা জনপদ। কালের এই ভাঙা-গড়ার লীলাখেলায় গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমির প্রসিদ্ধ জনপদ, বর্তমান পাবনা জেলার অন্যতম সমৃদ্ধ ভূখন্ড আটঘরিয়া নামের উপজেলা। ইতিহাসের পাতার চোখ মেললে দেখা যায়, আটঘরিয়া বহুকালের পুরানো জনপদ। জানা যায়, গুপ্ত সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের শাসনামলে (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪-৩০০) ‘বঙ্গবিভাগ’ নামে যে-এলাকা ছিল পাবনা ছিল তার অন্তর্ভুক্ত। সেকালে পোদ জাতির মানুষ বসবাস করতো পাবনা জেলার বিভিন্ন স্থানে। ‘‘পোদ জাতির’’ আটজন মানুষ সর্বপ্রথম আটঘরিয়ায় বসতি স্থাপন করেছিল। অতি প্রাচীনকাল থেকে এ-অঞ্চলেরধলেশ্বর এবং খিদিরপুরে বাগদি ও বুনোরা আদিবাসী মানুষ বসবাস করে আসছে।

    ‘মহাভারত’ রচনার সময় এ-অঞ্চল ছিল সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত। পরে গঙ্গার মোহনায় ধীরে ধীরে হিমালয়ের পলি জমতে থাকে এবং বদ্বীপ সৃষ্টি হয়ে ক্রমে বঙ্গের নিম্নভাগ গড়ে ওঠে। একইভাবে জেগে ওঠে আটঘরিয়া। পান্ডবরা তীর্থযাত্রা উপলক্ষে সাগরসঙ্গমে স্নান করতে এসে যে-স্থানে (ত্রিহুত, দ্বারভাঙ্গা প্রভৃতি জেলা) উপনীত হয়েছিলেন, তা বঙ্গের উত্তরে অবস্থিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। মহাভারতের বনপর্বের তীর্থযাত্রা প্রকরণের বিবরণে জানা যায়, সাগর বিস্তৃত ছিল বগুড়ার দক্ষিণপ্রান্ত পর্যন্ত। পান্ডবেরা করতোয়ার পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত এসেছিলেন। এই করতোয়া নদী ক্রমে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে পাবনা জেলার পূর্ব দিক দিয়ে চলে গেছে। এ থেকে বলা যায়, মহাভারত রচনার কালে পাবনা জেলা তথা আটঘরিয়ার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, এ অঞ্চল তখন সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত ছিল, ছিল বঙ্গ ও পুন্ড্র বিভাগের অন্তর্গত। একসময় এর পশ্চিম-দক্ষিণ ও পূর্বদিকে পদ্মা ও যমুনা নদী প্রবাহিত ছিল। এ অঞ্চল তখন ছিল জলমগ্ন। ঠিক কবে নদীর বুকে মাথা উঁচু করে এ অঞ্চল জেগে উঠেছিল তা বলা কঠিন, তবে আটঘরিয়া ও ঈশ্বরদীর কিছু অংশ যে বহুপূর্বে নদীর বুকে জেগে উঠেছিল, তা ভূ-প্রকৃতির গঠন-বিন্যাস থেকে অনুমান করা যায়। আটঘরিয়ার ভূ-প্রকৃতি ও পুরনো বৃক্ষরাজি দেখে অনুমান করা যায়, এ অঞ্চল বহু পুরনো। শ্রীকোলের বটগাছ, সড়াবাড়িয়ার জামগাছ, দিঘির বিলের উত্তর পাশের সুপ্রাচীন তালগাছ ছাড়াও বহু পুরনো নারিকেল ও সুপারি গাছ রয়েছে আটঘরিয়ায়। যে ‘পমবাহ্’ বা তুলাজাত আঁশ থেকে পাবনা নামের উৎপত্তি হয়েছে, সেই কার্পাস তুলা আটঘরিয়ার প্রাচীনত্বকে আরও প্রমাণগ্রাহ্য করেছে। চন্দ্রাবতী নদীর দু-পাশে উৎপাদিত কার্পাস তুলার হাসি এখনো জানান দিচ্ছে আটঘরিয়ার সমৃদ্ধ ও গৌরবময় অতীতকে। 

    গুপ্ত সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে এ অঞ্চলে মানববসতি গড়ে ওঠে। প্রাচীনকালে আটঘরিয়া  অঞ্চল পৌন্ড্রবর্ধন বিভাগের অধীন ছিল। তখন এখানকার অধিকাংশ স্থান ছিল জলমগ্ন। পরবর্তীকালে গড়ে ওঠে বেরুয়ান, সড়াবাড়িয়া, মাজপাড়া, শ্রীকোল প্রভৃতি গ্রাম। পাল শাসনামলে এ এলাকায় ব্রা‏‏‏‏‏হ্মণ ও কায়স্থদের বাস ছিল, সেন রাজত্বের শেষ দিকে সংঘটিত কৈবর্ত বিদ্রোহে এখানকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে, এখনও আটঘরিয়ার বিভিন্ন গ্রাম, যেমন কামাগাঁওসহ নানা এলাকায় মৎস্যবিক্রেতা ‘জিয়ানি’দের বসবাস রয়েছে, এরা কৈবর্তদের উত্তর-পুরুষ।

    মুসলমান শাসনামলে আটঘরিয়া গৌড়-লখনৌতির মুসলিম শাসনাধীনে আসে। সেন রাজত্বের শেষের দিকে পার্শ্ববর্তী শাহজাদপুরে হযরত শাহ মখুদুম (র.)-এর আগমন ঘটে। এরপর আশপাশের এলাকার মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ শুরু করে। শেরশাহের শাসনামলে আটঘরিয়া সরকার সোনাবাজুর অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে এ অঞ্চল সরকার সোনাবাজু, বাজুহা (‘আইন-ই-আকবরি’র বর্ণনা অনুসারে), বার্বাকাবাদ ও মাহমুদাবাদ প্রভৃতির অধীন ছিল। মুর্শিদকুলী খাঁর নবাবী আমলে ও সুজা খাঁর সময় জমিদারি প্রথার প্রবর্তন হলে এ-অঞ্চল প্রথমে সাঁতৈলরাজ ও পরে রাজশাহী (নাটোর) জমিদারির ভাতুরিয়া পরগণার মধ্যে স্থান পায়। হোসেন শাহের রাজত্বকাল ‘স্বর্ণযুগ’ নামে পরিচিতি পায়। জানা যায়, হোসেন শাহের সময় এ দেশের ধনী লোকেরা স্বর্ণপাত্র ব্যবহার করতো, নিমন্ত্রিত সভায় যিনি যত বেশি স্বর্ণপাত্র দেখাতে পারতেন তিনি তত মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হতেন। এ থেকে ধারণা করা যায়, বঙ্গের অধিবাসীরা তখন সুখী ও সম্পদশালী ছিলেন।

    মধ্যযুগে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর মানুষ যখন ব্যাপক হারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ শুরু করে, তখন হিন্দু ধর্ম অস্তিত্ব-সঙ্কটে পড়ে। ঐ সময় শ্রীচৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩) বৈষ্ণব ধর্ম প্রবর্তন করলে অগণিত ভক্ত তাঁর অনুসারী হয়। আটঘরিয়াতেও এর প্রভাব পরে। এখানকার শ্রীপুর, লক্ষ্মীপুর, শ্রীকোল, একদন্ত, শিবপুর প্রভৃতি গ্রামে বৈষ্ণবদের বাস ছিল। জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এখানকার মানুষ বিদ্রোহ করেছিল। জনশ্রুতি আছে, নীলকররা চন্দ্রাবতী নামক এক নারীকে নদীতে ডুবিয়ে হত্যা করেছিল বলে আটঘরিয়ার প্রধান নদীটির নাম হয়েছে চন্দ্রাবতী নদী। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানী লাভের পর এ-অঞ্চল প্রধানত রাজশাহীর নাটোর জমিদারি ভাতুরিয়া চকের এবং কিছুটা বড়বাজু ও কাগমারী জমিদারির অধীন ছিল। নাটোরের রাণী ভবানীর দেওয়া দেবোত্তর সম্পত্তির নামেই এখানকার একটি স্থানের নাম হয়েছে দেবোত্তর। ১৭৭২ সালে বঙ্গদেশে জেলা ব্যবস্থার উদ্ভব হয়, ১৯২৮ সালের ১৬ই অক্টোবর আটঘরিয়া পাবনা জেলার অধীন হয়।

    ইংরেজ আমলে এ-এলাকায় চোর-ডাকাতের ব্যাপক উপদ্রব ছিল। চলনবিল অঞ্চলের ডাকাতদের অভয়ারণ্য ছিল এ-এলাকা। জনগণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ইংরেজ আমলে আটঘরিয়াতে একটি পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ করা হয়। পরে মাতঙ্গিনী সিংহ নামক এক মহিলা থানার জন্য ১১ বিঘা জমি দান করেন। ঐ জমির উপর ১৯৩৪ সালে আটঘরিয়া পুলিশ স্টেশন বা থানার ভবন নির্মাণ করা হয়। ১৯৬২ সালে সেখানে গড়ে ওঠে প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্র। ১৯৮৩সালেপ্রশাসনিককাঠামোরপরিবর্তনকরেআটঘরিয়াথানাকেউপজেলায়উন্নীত  করাহয়।ঐবছর১৪সেপ্টেম্বরআটঘরিয়া  উপজেলারভিত্তিপ্রস্তরস্থাপনকরাহয়।

    আটঘরিয়া উপজেলার অফিসসমূহ দেবোত্তরে অবস্থিত। এই দেবোত্তরের সমৃদ্ধিও মূলে রয়েছে এক বর্ণিল ইতিহাস। জানা যায়, নাটোরের রানী ভবানী আটঘরিয়ার মুনিদহ গ্রামের রামকান্ত মজুমদার নামক বারেন্দ্র কায়স্থভুক্ত এক ব্যক্তিকে পরিবারিক বিগ্রহ সেবার ব্যয় নির্বাহের জন্য এই গ্রামটি দেবোত্তর স্বরূপ দান করেছিলেন। সেজন্য এই  স্থানটি দেবোত্তর নামে পরিচিতি লাভ করেছে। আটঘরিয়া শহর বলতে এখন দেবোত্তরকেই বাঝানো হয়। উপজেলার বেশিরভাগ অফিস এখানেই নির্মাণ করা হয়েছে।    

 

০৪. নামকরণ : আটঘর থেকে আটঘরিয়া ...

আটঘরিয়া নামের পেছনে রয়েছে জনশ্রুতি, কিংবদন্তি ও ইতিহাসের নানা ঘটনাপ্রবাহ। ইতিহাস পাঠে জানা যায়, আতি প্রাচীন কালে মহাভারতের পান্ডব ভ্রাতাগণের রাজত্ব ছিল এ-অঞ্চল। সেকালে পাবনা জেলার উত্তরের বৃহৎ চলন বিল, যা চাটমোহরের দক্ষিণ সীমানা পর্যন্ত  বিস্তৃত ছিল। পশ্চিমে ও দক্ষিণে গঙ্গা বা পদ্মা নদী এবং পূর্ব দিকে যমুনা নদী প্রবাহিত ছিল। তখন পাবনার অধিকাংশ অঞ্চল ছিল জলমগ্ন। ভূ-প্রকৃতির গঠন অনুসারে তখন পাবনার মূল ভূখন্ডের যে-অস্তিত্ব ছিল, তা ছিল মূলত ঈশ্বরদীর কিছু অংশ এবং পুরো আটঘরিয়া গ্রাম, যা পদ্মার শাখা চন্দ্রাবতীর পূর্বতীরে অবস্থিত ছিল। জনশ্রতি রয়েছে সর্বপ্রথম এখানে আট ব্যক্তি মিলে আটটি ঘর তুলে একটি পাড়ায় বসতি গড়ে তোলে। ক্রমে আট ঘর বসতি থেকে আটঘরিয়া নামের উৎপত্তি  হয়েছে।

    আরেকটি তথ্য থেকে জানা যায়, ভারতসম্রাট চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪-৩০০ অব্দে) ‘‘বঙ্গবিভাগ’’ নামে যে-এলাকা ছিল, পাবনা ছিল তার অন্তর্ভুক্ত। ঐ সময় এ-অঞ্চলে ‘‘পোদ জাতির’’ আট ঘর মানুষ এখানে বসতি স্থাপন করে। ফলে এলাকাটির নামকরণ হয় আটঘরিয়া। পোদ জাতির মানুস পাবনা জেলার বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতো। এ অঞ্চলে তাঁদের বসতি স্থাপন অসম্ভব নয়। এখনও আটঘরিয়ার বিভিন্ন স্থানে বাগদি ও বুনো আদিবাসীর লোকদের বসবাস দেখা যায়। এঁরা পোদ জাতির আদিবাসীদের উত্তরাধিকার বলে ধারণা করা যায়।

    কেউ কেউ বলেন, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহের অপরাধে আটজন সিপাহীকে নদী-অরণ্য-বেষ্টিত, সাপ-মশা-মাছির অভয়ারণ্য, এই এলাকার জঙ্গলে নির্বাসন দেওয়া হয়। নির্বাসিত সেই সিপাহীরা বুদ্ধি খাটিয়ে এ অঞ্চলে নিজেদের বসতের উপযোগী করে তোলে। নির্বাসিত সিপাহীরা প্রথমে আটটি ঘর বা বসতবাড়ি তৈরি করে এ-এলাকায় বসবাস শুরু করায় স্থানটির নাম হয় আটঘরে বা আটঘরিয়া।

    তবে কখন কার কর্মকোলাহলে এ অঞ্চলে প্রাণচাঞ্চল্য জেগেছিল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন ; কিন্তু এ-কথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, এই এলাকায় আটজন কিংবা আটঘর মানুষ প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল। সেই আট ঘর বসতি থেকেই আটঘরিয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে, এ-কথা নিঃসন্দেহে ও নিঃসংশয়ে বলা যায়।

 

৫। সংসদ সদস্য

    আটঘরিয়া জাতীয় সংসদের ৭১ নং আসনের (পাবনা-৪, ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) অন্তর্ভুক্ত। এ সংসদীয় আসন থেকে বিভিন্ন সময় জাতীয় পরিষদ সদস্য, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন - এডভোকেট আমিন উদ্দিন, মহিউদ্দিন আহমদ, আবদুল বারী সরদার, সিরাজুল ইসলাম সরদার, পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস, মঞ্জুর রহমান বিশ্বাস, জনাব শামসুর রহমান শরীফ  (৪ বার)।  এলাকার উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে রেখেছেন অসামান্য অবদান।  

 

০৬.নদ-নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশের চিরন্তন রূপের প্রতিচ্ছবি আটঘরিয়ার প্রকৃতির মধ্যে পরিদৃষ্ট হয়। এর হৃদয়তন্ত্রীতে প্রবাহিত হয়েছে অনেক নদী, বিল ও জলাশয়। চন্দ্রাবতী, ইছামতী, রত্নাই, চিকনাই ও কমলা নদীর জলধারা এখানকার প্রকৃতিকে করেছে সৌন্দর্যমন্ডিত ; দিঘির বিল, সানকিভাঙা বিল, গজারিয়া বিল, কৈডাঙি বিল, খলসাবাড়ি বিল, হোগলবাড়ি বিল, আঠারো খাদা বিল, কলমিগাড়ি বিল, মধুগারি বিল, চত্রার বিল, জলকার বিল, গুবিদের বিল, গারুলের বিলসহ অসংখ্য বিল এখানকার প্রকৃতিকে দান করেছে স্নিগ্ধতা। সারি সারি নারকেল ও সুপারী গাছ, আম-জাম-তাল-কলা-শিমুল-মেহগনিসহ নানা জাতের বৃক্ষ-পল্লব শোভিত এ-অঞ্চল অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। বিভিন্ন ঋতুতে বিচিত্র ফল-ফুল ও ফসলের সমারোহে আটঘরিয়ার প্রকৃতি অনন্য নান্দনিক সৌকর্যে পরিপূর্ণ থাকে। সেই রূপ-সৌন্দর্য স্মরণ করিয়ে দেয় চিরায়ত বাংলার রূপচ্ছবিকে। তখন জীবনানন্দ দাশের মতো আমাদেরও বলতে ইচ্ছে করে : ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’। 

 

০৬. ঐতিহ্য আর পুরাকীর্তি : পাষাণে বাঁধা জীবনকথা

আটঘরিয়ার ঐতিহ্যে উজ্জ্বল সাক্ষ্য হয়ে আছে এখানকার কার্পাস তুলা। বহু প্রাচীন কাল থেকে পাবনা জেলার এই অঞ্চলে এই তুলার চাষ হয়ে আসছে। চন্দ্রাবতী নদীর পাশ দিয়ে গড়ে ওঠা জমিতে এখনও প্রচুর কার্পাস তুলার চাষ হয়। এই তুলা বা তুলাজাত অাঁশকে ফারসিতে বলা হতো ‘পম্বাহ’। এই ‘পম্বাহ’ থেকে পাবনা নামের উৎপত্তি হয়েছে। কাজেই পুরনো জনপদ আটঘরিয়া পাবনা নামের উৎপত্তির ঐতিহ্যেরও ধারক বলা যায়। এখানকার বিভিন্ন পুরাকীর্তির পাষাণের গায়ে গায়ে লেখা আছে বহুযুগের ইতিহাস আর নানা উত্থান-পতনের ঘটনাধারা। কয়েকটি পুরাকীর্তির পরিচয় :

 

০৬.১. মৃধার মসজিদ (শাহী মসজিদ)

আটঘরিয়ার মাজপাড়া গ্রামের খানবাড়ি মসজিদের আধা কিলোমিটার পশ্চিমে মৃধার মসজিদ অবস্থিত। এটি আটঘরিয়ার সর্বপ্রাচীন মসজিদ। মসজিদটি বহুদিন মাটিচাপা অবস্থায় পড়ে ছিল। চারপাশে খনন করে মসজিদটি মাটির নীচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সংস্কার করে এটিকে নামাজ পড়ার উপযোগী করেছে। এ-মসজিদ আয়তাকার এবং তিন গম্বুজ-বিশিষ্ট। এতে তিনটি প্রবেশপথ ও একটি মিহরাব রয়েছে। মূল প্রবেশপথের শীর্ষভাগে কালেমা তৈয়বা লেখা ছিল, সংস্কার করার ফলে তা ঢেকে গেছে। এর নির্মাণকাল আনুমানিক সতের সতকের শেষভাগ কিংবা আঠার শতকের প্রথম ভাগ।  

 

০৬.২. খানবাড়ি মসজিদ

মসজিটি মাজপাড়া গ্রামের খানপাড়ায় অবস্থিত। আনুমানিক ৩০০ বছর পূর্বে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদটি আয়তাকার তিন গম্বুজ-বিশিষ্ট। এর দৈর্ঘ্য ১০.০৬ মিটার (২২ হাত), প্রস্থ ৬.৪০ মিটার (১৪ হাত)। ভূমি থেকে কার্নিশ পর্যন্ত উচ্চতা ৩.৬৬ মিটার (৮হাত)। মূল মসজিদের প্রবেশপথ তিনটি, তবে এর সামনের প্রবেশপথের সংখ্যা ৫টি। এর দেয়াল পৌনে ২ হাত চওড়া। চারে কোণে রয়েছে ৪টি অষ্টভুজাকৃতির পার্শ্ব-বুরুজ। এর কেন্দ্রীয় গম্বুজটি দু-পাশের গম্বুজ থেকে তুলনামূলকভাবে উঁচু এবং বড়। মসজিদের ভেতরে মোট পাঁচটি ছোট-বড় অবতল কুলঙ্গি আছে। এতে একটি তিন ধাপবিশিষ্ট মিম্বার ও ১টি মিহরাব রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে ১টি করে জানালা আছে। এ-মসজিদের কোনো মিনার নেই, গায়ে স্ট্যাকো নকশায় লতাপাতার অলঙ্করণ ও ক্যালিগ্রাফিক স্টাইলে কালেমা তৈয়বা লেখা আছে। গম্বুজের চূড়ায় একটির পর একটি কলস সাজিয়ে ফিনিয়াল তৈরি করা হয়েছে। ফিনিয়ালের চূড়ায় রয়েছে পদ্মকলি। মসজিদটি বর্তমানে আদি অবস্থায় নেই। ১৩৩৬ সালে এটির জুল্লার সামনে জুল্লার সম পরিমাণ প্রায় ৭ হাত জায়গা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

 

০৬.৩ বেরুয়ান জামে মসজিদ

এই মসজিদ আটঘরিয়া উপজেলার চাঁদভা ইউনিয়নের বেরুয়ান গ্রামে অবস্থিত। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি না থাকায় এর নির্মাণকাল সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায় না। স্থাপত্য-বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে এর নির্মাণকাল আনুমানিক সতের শতকের শেষে বা আঠার শতকের শুরুতে বলে ধারণা করা হয়। মসজিদটি আয়তাকার তিন গম্বুজ-বিশিষ্ট। বাইরে থেকে এর দৈর্ঘ্য ১৪.১৯ মিটার, প্রস্থ ৫.৯০ মিটার; ভেতর থেকে দৈর্ঘ্য ১৩.৩০ মিটার, প্রস্থ ৪.০০ মিটার। এর চারটি বহির্কোণে রয়েছে ৪টি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ, বুরুজের শীর্ষভাগ ক্ষুদ্রাকৃতির কিউপোলাবিশিষ্ট। মসজিদটি তিনটি গম্বুজ দ্বারা আবৃত, সামনে রয়েছে তিনটি চতুর্কেন্দ্রিক খিলানবিশিষ্ট প্রবেশপথ। মূল প্রবেশপথটি দু-পাশের খিলান থেকে উঁচু। এর পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি আবতল মিহরাব, মূল মিহরাবটি দু-পাশের মিহরাব থেকে উঁচু। মসজিদটির গম্বুজগুলোর নীচের অংশ, পার্শ্ববুরুজের ক্ষুদ্র কিউপোলারের নীচের অংশ ও কার্নিশ পদ্মপাপড়ির মারলন নকশাখচিত। মূল প্রবেশপথ ও মিহরাবের উভয় পাশে রয়েছে একটি করে নিমগ্ন স্তম্ভ। মসজিদের সামনে খোলা মাঠ রয়েছে। বার বার সংস্কারের ফলে এর আদি বৈশিষ্ট্য অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে।

 

০৬.৪ গোড়রী আদি দূর্গা মন্দির

আটঘরিয়া উপজেলার দেবোত্তর ইউনিয়নের গোড়রী গ্রামে অবস্থিত। গোড়রী বাজার থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার পূর্ব দিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ির মধ্যে এ-মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায়। মন্দিরটি আয়তাকৃতির। দৈর্ঘ্য ৪.৫৭ মিটার, প্রস্থ ৩ মিটার। এর দক্ষিণ পাশে ভাঙা বারান্দার অংশ দেখা যায়। মন্দিরটির প্রবেশপথ দক্ষিণ দিকে। তিন খিলানবিশিষ্ট প্রবেশপথের ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। জানা যায়, গোপাল সাহা নামক জনৈক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।   

                            

০৭. ধর্ম : মসজিদে আজান শুনি, মন্দিরে উলুধ্বনি

আটঘরিয়ার মসজিদে মসজিদে শোনা যায় আজানের সুললিত সুর; মন্দিরে মন্দিরে শোনা যায় উলুধ্বনি আর ঢাকের তাক-ডুমা-ডুম আওয়াজ। আটঘরিয়ায় বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করেছে। একেবারে প্রাচীনকালে এ-অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করতো। বৌদ্ধতান্ত্রিক কালের নিদর্শন হিসেবে সিদ্ধেস্বরীর পূজা ও শূকর বলিদান প্রচলিত ছিল। বৌদ্ধদের হটিয়ে সেন রাজারা বাংলার শাসনক্ষমতা গ্রহণ করলে এ অঞ্চলে হিন্দু তথা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রসার ঘটে। দলে দলে এ-অঞ্চলে বসতি গড়ে তুলতে থাকে ব্রাহ্মণরা, চলতে থাকে তাঁদের ধর্মীয় নানা অনুশাসন। বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়ের পর আবার বদলে যায় দৃশ্যপট। শাসনক্ষমতা থেকে সেন রাজারা বিতাড়িত হলে ব্রাহ্মণ্য তথা হিন্দু ধর্মের প্রভাব কমতে থাকে। মুসলিম শাসকদের তরবারির আঘাতে ব্রাহ্মণ্য দম্ভ চূর্ণ হয়। মুসলিম শাসকদের সাথে ধর্মপ্রচারের জন্য আসেন পির, দরবেশ, আউলিয়ারা। ইসলামের সাম্য, মৈত্রী আর ভ্রাতৃত্বের আহবানে মুগ্ধ হয়েও দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। হিন্দুধর্ম চরম সঙ্কটে পড়ে। সাঁথিয়ার পার্শববর্তী শাহজাদপুর অঞ্চলে আগমন ঘটে হযরত শাহ মখদুম (র.) ও তাঁর অনুসারীদের। রাধারমণ সাহা লিখেছেন : ‘বক্তিয়ার খিলজির বঙ্গাধিকার কালের সমকালেই উক্ত পল্লীতে শাহ্জাদা শাহ মখদুম সাহেবের অবস্থান জানা যায়।’ (পৃ. ৫০১) এরপর আটঘরিয়াসহ পাবনার বিভিন্ন স্থানে একে একে আগমন ঘটে ইসলাম প্রচারকগণ। পাঠান আমলে এখানে আগমন ঘটে মুসলিম সাধকদের। পার্শ্ববর্তী সমাজ গ্রামে পাঠানদের ব্যাপক প্রভাব ছিল।  

    ইসলাম ধর্মের এই সর্বগ্রাসী প্রভাবের যুগে হিন্দুধর্ম যখন চরম সঙ্কটে নিমজ্জিত, তখন বৈষ্ণব ধর্মের প্রেমের আহবান নিয়ে আটঘরিয়ার মানুষকে বিমোহিত করেন শ্রী চৈতন্যদেবের ভক্ত, শিষ্য ও অনুসারীবৃন্দ। শ্রীপুর, লক্ষ্মীপুর, শিবপুর প্রভৃতি গ্রামের নাম এখনও হিন্দু-বৈষ্ণব ধর্মের স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে। ইংরেজদের আগমনের ফলে এ অঞ্চলে খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটে। তবে এ ধর্ম আটঘরিয়ার মানুষকে তেমন টানতে পারেনি। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী চামার ও হরিজন প্রভৃতি পেশার স্বলসংখ্যক লোক এ-অঞ্চলে বাস করে।

    বর্তমানে এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্মাবলম্বী লোকের সংখ্যাই বেশি, হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা হাতে গোণা। আবহাওয়া ও প্রকৃতিগত কারণে আটঘরিয়ার মানুষ সহজ-সরল ও আবেগপ্রবণ। বিভিন্ন সময় তাঁরা বিভিন্ন ধর্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তাদের বিশ্বাস ও চেতনার মধ্যে তাই বিভিন্ন ভাবাদর্শ মিশে গেছে। সহজ-সরল জীবনদর্শনে অভ্যস্ত হওয়ায় সহজেই এরা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এখনও আটঘরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পির ও ধর্মব্যবসায়ীদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে মাজার ও খানকা। হাড়লপাড়া খানকা শরিফ, একদন্তত খানকা শরিফ ও চাঁদভা মাজারে বছরের বিভিন্ন সময় ওয়াজ-নছিয়ত হয়। সারা বছর খানকাহ ও মাজারকে কেন্দ্র করে সরলপ্রাণ ভক্তহৃদয়ের আনাগোনা থাকে। বছরের বিভিন্ন সময় এখানকার মসজিদ, মাদ্রাসা, গোরসত্মানকে কেন্দ্র করে ইসলামি জালসা হয়। বিশেষ করে শীতকালে গ্রামে গ্রামে চলে ওয়াজ মাহফিলের উৎসব। বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মাওলানা, পির, হাফেজ, আলেম, ওলামার ওয়াজে মুখরিত হয় আটঘরিয়ার আকাশ-বাতাস-মাঠ-প্রান্তর। দেশীয় আলেমদের পাশাপাশি ভারতবর্ষের মেদিনিপুর, ফুরফুরা শরিফের পিরদের আগমনে ও তাঁদের ওয়াজ-নছিহত শুনে আটঘরিয়ার মানুষ ধর্মবিশ্বাসের আপ্লুত হয়।

    বিভিন্ন ধর্মের উত্থান-পতনের সময় আটঘরিয়ায় বিভিন্ন সময় সংঘটিত হয়েছে এক ধর্মের মানুষের সাথে অন্য ধর্মের মানুষের বিরোধ ও কলহ-বিবাদ। প্রাচীন ও মধ্যযুগে যেমন এই বিরোধ ছিল, তেমনি আধুনিক কালেও সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের কারণে এক ধর্মের মানুষের সাথে অন্য ধর্মের মানুষের বিরোধ-বিসম্বাদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজ আমলে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ, বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত প্রকট আকার ধারণ করে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আটঘরিয়া থেকে দলে দলে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা ভারতে চলে যায়। ধর্মের দোহাই দিয়ে আটঘরিয়া অঞ্চলে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে। এক সময় আটঘরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু জমিদারদের প্রভাব ছিল। জমিদাররা তাঁদের মাটিতে মুসলমানদের গরু কোরবানি করতে বাঁধা দিতো। মুসলমানরা তাদের বাড়িতে গেলে চটের ওপর বসতে দিতো। এমনকি তাদের মাটির ওপর দিয়ে মুসলমানদের ঘোড়ায় চড়ে যাওয়া নিষেধ ছিল।

    ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আটঘরিয়ার অনেক মুসলমান হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করেছে, তাদের মন্দিরের মূর্তি ভেঙেছে, বাড়িতে লুটপাট চালিয়েছে। এরফলে হিন্দুরা দলে দলে দেশ ছেড়ে চলে যায়। তাদের সম্পতি দখল করে অনেকে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। এভাবে নানা চড়াই-উৎড়াইয়ের ভেতর দিয়ে আটঘরিয়ায় একেক সময় একেক ধর্মের জয়ধ্বজা উড়েছে। তবে এখানকার মাটির তেমন পরিবর্তন হয়নি, কেবল পরিবর্তিত হয়েছে মানুষের বিশ্বাস ও চেতনার জগৎ। দেখা যায়, যে-বাড়িতে একসময় তুলসীতলে প্রদীপ জ্বলে উঠতো, উলুধ্বনি শোনা যেতো কিংবা শঙ্খ বেজে উঠতো - সে-বাড়িতে এখন শোনা যায় আজানের ধ্বনি কিংবা কোরআন তেলাওয়াতের সুর। ভিটেমাটি কিংবা স্থান ঠিকই আছে, কেবল পরিবর্তিত হয়েছে মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মাদর্শ। যেসব বাড়ি, জমিজমা ও সম্পদের মালিক একসময় ছিল হিন্দু, এখন সেসব সম্পদ ভোগ-দখল করছে মুসলমানেরা। জমির পুরানো দলিলপত্র বের করলেই চোখে পড়ে দাস, ঠাকুর, চক্রবর্তী, সাহা, সান্যাল, রায়,ঘোষ, কামার প্রভৃতি বংশ পদবীধারীদের নাম। এখন তার স্থলে চোখে পড়ে খা, মোল্লা, খন্দকার, আকন্দ, শেখ প্রভৃতি পদবীধারীদের নাম। বিরোধ-বিসম্বাদ থাকলেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির উদাহরণও কম নয়। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে। একের উৎসবে অন্যে আনন্দের ভাগী হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করেছে, যেমন - একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অগণিত হিন্দু-মুসলমান একাত্ম হয়ে পাকবাহিনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুদূর প্রাচীন কাল থেকে বহু ধর্মাবলম্বী মানুষের রক্তের ধারা মিশেছে আটঘরিয়ার মানুষের রক্তধারায়। এক ধর্মের মানুষের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে অন্য ধর্মের মানুষ। একের বিশ্বাস-আচার ও সংস্কার অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, মুসলমানদের বিয়েতে যৌতুকগ্রহণের বিষয়টি হিন্দুদের প্রভাবের ফল। সার্বিক বিশ্লেষণে বলা যায়, বড়ই বৈচিত্র্যপূর্ণ আটঘরিয়ার মানুষের ধর্মীয় ইতিহাস। ইতিহাসের পাতা উল্টালে চোখে পড়ে বিচিত্র কৌতুহলোদ্দীপক সব ঘটনা। বর্তমানে এখানে সুন্নী মুসলমানের সংখ্যাধিক্য সহজেই চোখে পড়ে।

 

০৮. আন্দোলন-সংগ্রাম : ‘বীরের এ রক্তস্রোত...’

আটঘরিয়ার মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসের ধারক-বাহক। এ অঞ্চলের মানুষ সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নানা মাত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে এখানকার সংগ্রামী জনতা। এখানকার মাটিতে আছড়ে পড়েছে কৈবর্ত বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, প্রজাবিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, স্বরাজ আন্দোলন, স্বদেশি ও অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ঢেঊ। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আটঘরিয়ার সংগ্রামী মানুষের রয়েছে বীরত্বের ইতিহাস। সে-ইতিহাসের কিছু পরিচয় তুলে ধরা হল :

 

০৮.১. বংশীপাড়া যুদ্ধ

আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া ইউনিয়নের চন্দ্রাবতী নদীর বংশীপাড়া ঘাটে ১৯৭১ সালে ৬ই নভেম্বর মুক্তিসেনাদের সাথে পাকসেনাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। বংশীপাড়া ঘাট থেকে  প্রায় আড়াই কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে রামচন্দ্রপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প ছিল। সেখানে  আটঘরিয়ার মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার মাজপাড়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন রেনুর নেতৃত্বে মুজববাহিনীর একটি দল ও ঈশ্বরদীর ওয়ারেস কমান্ডারের নেতৃত্বে আরেকটি দল অবস্থান করছিলেন। এ খবর আটঘরিয়া থানার শান্তিকমিটির লোকদের মাধ্যমে পাকসেনাদের কাছে চলে যায়। তারপর ৬ই ডিসেম্বর পাবনায় অবস্থানরত পাকসেনাদের প্রায় ১০০ জনের একটি দল ক্যাপ্টেন তাহের খানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করার জন্য বংশীপাড়া ঘাটে পৌঁছে। এ সময় রামচন্দ্রপুর ক্যাম্পের অমিততেজী মুক্তিযোদ্ধারা পাক-বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। এক পর্যায়ে পাকবাহিনীর ক্যাপ্টেন তাহের খান মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পাকসেনারা মরিয়া হয়ে ওঠে, মুক্তিযোদ্ধারাও চালায় পাল্টা আক্রমণ। পাকসেনাদের গুলিতে শহিদ হন আটঘরিয়ার বেরুয়ান গ্রামের আবুল কাশেম, মাজপাড়া গ্রামের আব্দুল খালেকসহ ঈশ্বরদী থানার বিভিন্ন গ্রামের ইউনুস আলী, নায়েব আলী, আব্দুর রশিদ, আব্দুল মালেক, শহিদুল ইসলাম, মুনছুর আলী, আব্দুর রাজ্জাক, নূর মোহাম্মদ, মোহসীন আলী ও আব্দুস সাত্তার। একইসাথে পাকসেনাদের গুলিতে শহিদ হন এলাকার আবুল কালাম, আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারী ও নূর আলীসহ ২২জন নিরীহ গ্রামবাসী। পাকবাহিনীর ক্যাপ্টেন তাহেরসহ প্রায় ৩০ জন পাকসেনা খতম হয় ঐ যুদ্ধে। বংশীপাড়া যুদ্ধের সংবাদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা থেকে প্রচার করা হয়। বংশীপাড়া যুদ্ধের স্মৃতি ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা অম্লান করে রাখতে চন্দ্রাবতী নদীর তীরে বংশীপাড়ায় নির্মাণ করা হয়েছে শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ।             

 

০৮.২. বেরুয়ান যুদ্ধ

১৯৭১ সালের ২২শে অক্টোবর আটঘরিয়া থানার চাঁদভা ইউনিয়নের হাড়লপাড়া ও বেরুয়ান গ্রামের মাঝখানে বেরুয়ান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৯৭১ সালে আটঘরিয়ার যুদ্ধকালীন কমান্ডার আনোয়ার হোসেন রেনুর নেতৃত্বে ৬জন মুক্তিযোদ্ধা মাজপাড়া গ্রামের আব্দুল হক শেখের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এ-সময় তারা খবর পান কিছু রাজাকার খিদিরপুর বাগদিপাড়ার নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছে। তখন আনোয়ার হোসেন রেনুর নেতৃত্বে ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা হাড়লপাড়া ও বেরুয়ানের মাঝামাঝি ভাঙা রাস্তার পাশে এ্যাম্বুস পাতেন। রাজাকারদের ফেরার পথে তাঁরা অতর্কিতে আক্রমণ চালান, শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। ভয়াবহ যুদ্ধে রাজাকাররা লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে শহিদ হন তোয়াজ উদ্দিন ও হায়দার আলী। যুদ্ধে নিহত হয় ১০জন রাজাকার। দুঃখের বিষয় বেরুয়ানের এই যুদ্ধকে স্মরণীয় করে রাখতে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা ফলক নির্মাণ করা হয়নি। রাস্তার দু-পাশের বাবলা গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে জানান দিচ্ছে দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তান আনোয়ার হোসেন রেনুদের অসামান্য বীরত্বের গৌরবকথা।    

 

০৮.৩ .আটঘরিয়া থানা আক্রমণ 

১৯৭১ সালের ১৩ই ডিসেম্বর কমান্ডার এম আই চৌধুরী ও শাহজাহানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা আটঘরিয়া থানা আক্রমণ করে। তবে এই আক্রমণ পরিকল্পিত ছিল না। রাতভর যুদ্ধ চলে পাকসেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের। ভোরের দিকে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান পরিবর্তন করে চলে যান। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম ও মোয়াজ্জেম হোসেন আহত হন। এর পরের দিন পাকসেনারা আটঘরিয়ার কুষ্টিয়াপাড়া, চাঁদভা, সঞ্জয়পুর, অভিরামপুর প্রভৃতি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। একইসাথে পাকসেনাদের হাতে শহিদ হন ৮জন নিরীহ গ্রামবাসী।

 

    এছাড়া আটঘরিয়ার বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে আটঘরিয়ার দামাল সন্তানেরা যুদ্ধ করেছেন। এফ. এফ কমান্ডার মোন্তাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি দল উচ্চ প্রশিক্ষণ শেষে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার মেহেদীপুর বর্ডার সোনা মসজিদ, ভোলাহাট থানা ও শাহাপুর ডিফেন্সে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে যুদ্ধ করেন। ঐখানে সম্মুখ যুদ্ধে শহিদ হন তোতা মিয়া। এভাবে দেশমাতৃকার মুক্তিসংগ্রামে আটঘরিয়ার বীর সন্তানেরা অসামান্য অবদান রাখেন। কেবল মুক্তিযুদ্ধই নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এ-উপজেলার মানুষের রয়েছে উজ্জ্বল অবদান। 

 

০৯. শিক্ষার আলোকবর্তিকা

আটঘরিয়া বাংলাদেশের অন্যতম শিক্ষা-সমৃদ্ধ এলাকা। এখানকার শিক্ষার হার ৫৬%। এ উপজেলায় স্থাপিত হয়েছে সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হল : আটঘরিয়া মহাবিদ্যালয়, চাঁদভা (১৯৭২) ; ডেঙ্গারগ্রাম মহাবিদ্যালয়, ডেঙ্গারগ্রাম (১৯৯২) ; পারখিদিরপুর ডিগ্রি কলেজ, পারখিদিরপুর (১৯৯৪) ; দেবোত্তর ডিগ্রি কলেজ, দেবোত্তর (১৯৯৫) ; বেরুয়ান মহিলা কলেজ, বেরুয়ান (১৯৯৫) ; খিদিরপুর টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ (২০০৩)। স্কুলগুলো হল : আটঘরিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৫৪), একদন্ত উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৫৯), পারখিদিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়  (১৯৬২), দেবোত্তর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়  (১৯৬৩), আশরাফ উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬৭), লক্ষ্মীপুর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৬৭), শহীদ আঃ খালেক উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৭০), কয়রাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৭২), মতিঝিল উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৮৫), জুমাইখিরী গোবিন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৮৭), কবি বন্দে আলী মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৮৮), চান্দাই উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৮৮), বি. এল. কে উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৯১), সড়াবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৯৩), রমেশ্বরপুর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৯৩), সারুটিয়া বি.এস. উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৯৪), আজাহার আলী উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৯৪), ইশারত আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৯৫), রামচন্দ্রপুর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৯৫), ডেঙ্গারগ্রাম নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৯৭), গোপালপুর চৌকিবাড়ী নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৯৮), কচুয়ারামপুর উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৯৮), কে. এইচ. এ. নিম্ন-মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় (১৯৯৯), পারখিদিরপুর নিম্ন-মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় (২০০০), বেরুয়ান নিম্ন-মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় (২০০০)। চাঁদভা ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯৪৯), মাজপাড়া সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯৪৪), বাওইখোলা ইয়াকুবিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা (১৯৮৭) প্রভৃতি।

 

১০. সাহিত্য-সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্য

সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আটঘরিয়ার রয়েছে বিশেষ অবদান। বাউল সাধক লালন শাহের স্মৃতিবিজড়িত স্থান এই আটঘরিয়া, এটা জানা যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘মনের মানুষ’-এর চলচ্চিত্রায়নের মাধ্যমে। বাউল সাধক শহিদ এম এ গফুর, লোককবি মালেক সরকার, পুঁথিপাঠক আবু মুছা আটঘরিয়ারই সন্তান। খ্যাতিমান গবেষক ইদরিস আলী, নাট্যপরিচালক ও ঔপন্যাসিক ড. জহির বিশ্বাস, সাহিত্যিক তারেক মাহমুদ  রচিত গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তরুণ কবি যাহিদ সুবহান, শফিক লিটন প্রমুখ এখানকার সাহিত্যাঙ্গনকে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে সদা তৎপর। বিশেষভাবে বলতে হয় আটঘরিয়ার লোকসাহিত্যের কথা। এ-অঞ্চলের প্যাচালী ও কবিগানের সুনাম দেশজুড়ে বিস্তৃত। আটঘরিয়ার লোকসঙ্গীত, ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ-প্রবচন এবং লোককথা বাংলা লোকসাহিত্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। এ-অঞ্চলের দুটি আঞ্চলিক গান : 

১.আরে ও গেদার মাও/আরে কি কও গেদার বাপ

কোনে গেলে তারা তারি নাস্তা দিয়ে যাও

নাদার ঘরে নাস্তা পাগে/ পাড়ে নিয়ে যাও

চখে যাব লাঙ্গল বব জলদি শুনে যাও

গেদা আবার কোনে গেল মজায় চলে যায়

বিয়েন বেলা ওহা ওহি আক্কেল শরম নাই

তোমার ঠেলায় পাড়ার লোহের চোহিত ঘুম নাই

সহাল বেলা গেদা যিনি আতইকুলে যায়

পাট বেচে ইলশে মাছ আন কেনে যিন গামছাও

বুড়ে কালে তোমার দেহি জোয়ানের রস বয়

আমার এক খান তাঁতের শাড়ি পান শুপারীউ নাই

লম্বা তোমার ঠাং দুখানা শরীর বর ভাও

দুতে শাড়ি জোড়া দিলিউ বাড়া থাহে পাও।

ছাওয়াল পলে শাড়ি আইনে বেশি কথা কও

বুড়ে মিনসের কথা শুনলী জ্বলে যায় মোর গাও (কথা : আ. মালেক সরকার)

 

        ২. পাবনা চল পাবনা চল পাবনা চল

ওজন পাবনা গেলে নাই ভাবনা

সব কিছু পাইবা ভাল

পুবেতে যমুনা ধারা দক্ষিণেতে পদ্মা ঘেরা

আবার পাক্শি ঘাটে সাড়ার ব্রিজ

দেখলে না কেন বল

গেঞ্জি ভাল পাবনার বাড়ী, রংবেরং এর তাঁতের শাড়ী

আবার দোগাছি আর শাজাদপুরের

তাইতে নাম হয় উজ্জলা

চলন বিলের নাইরে জুড়া,

ভদ্র গায়ে বাইশ পাড়া

আবার সাগর কান্দির দই খেলে ভাই

রয় সনে চিরকাল

ঈশ্বরদীতে রেলের গোড়া,

মোহনপুরের দুগ্ধ সেরা

আবার চাটমহরের রস মালাই

খেয়ে হয় মনভালা

জজ কোটেরী শোভা ভারি,

নিত্তি মাফিক বিচার তারি

আবার সকল জেলার পাগল এসে

 এই জেলাতেই হয় ভাল   (কথা : এম এ গফুর)

        

 

     আটঘরিয়ার খ্যাতি ছড়াতে অবদান রেখে চলেছে এখানকার কৃতিসন্তানেরা। তাঁদের কর্মের গুণে সমৃদ্ধি ও খ্যাতিলাভ করেছে অনেকগুলো গ্রাম। আটঘরিয়া প্রসিদ্ধ স্থানগুলো হল - চাঁদভা, বেরুয়ান, আটঘরিয়া, দেবোত্তর, গোড়রী, উত্তর চক, মাজপাড়া, বংশীপাড়া, পারখিদিরপুর, একদন্ত, লক্ষ্মীপুর, যাত্রাপুর, ডেঙারগ্রাম, জোমাইখিরি, শিবপুর, লক্ষ্মীপুর, বাওইখোলা, শ্রীপুর প্রভৃতি। আটঘরিয়াকে প্রসিদ্ধি দান করেছে এখানকার বাঁশশিল্প, লোহা শিল্প, বাচামাড়া শাড়ি, পারখিদিরপুর বাজারের সমবায় মার্কেটসহ বিভিন্ন হাট-বাজার, তৈলশিল্প, গামছা, তাঁতশিল্প, গুচ্ছগ্রাম, আদর্শগ্রামসহ নানা কিছু। আটঘরিয়া উপজেলা এতটাই সমৃদ্ধ, ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবদীপ্ত যে স্বল্প পরিসরে তার পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব নয়। এখানে আটঘরিয়ার ইতিহাসের একটা সংক্ষিপ্তসার বিবৃত করা হলো মাত্র। (পরবর্তী পর্যায়ে সময়-সুযোগ বুঝে আটঘরিয়ার ওপর পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার ইচ্ছা রইল।) প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ, রাজনৈতিক ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাহিত্য-সংস্কৃতি সব দিকে থেকেই আটঘরিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। গৌরবময় অতীতের সাথে সমৃদ্ধ বর্তমান মিলে আটঘরিয়া সত্যিই লাভ করেছে এক তিলোত্তমা উপজেলার মর্যাদা। এখানে বাস করে, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি, ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবীসহ অগণিত পেশার মানুষ। বাগদি ও বুনো আদিবাসীর কিছু লোক বাস করে এ উপজেলায়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে উঠেছে এখানকার কৃষকদের উৎপাদিত ফসল। আমার দৃষ্টিতে কৃষকরাই আটঘরিয়ার উন্নতির মূল কর্ণধার। সরেজমিনে ঘুরে আটঘরিয়ার ফসলের মাঠ দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। শিম, বেগুন, পাতা কপি, ফুল কপি, বিচিত্র সব্জি, কার্পাসের মাঠ ; কলা, আম, জাম, তাল, সুপারি, নারিকেল প্রভৃতির ঐশ্বর্যে আটঘরিয়া হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের উন্নতি ও অগ্রগতির নিত্য সহোচর।

 

[লেখক-পরিচিতি : ড. এম আবদুল আলীম, গবেষক-প্রাবন্ধিক, (প্রাক্তন বিসিএস কর্মকর্তা : প্রভাষক,  ঢাকা কলেজ ও এডওয়ার্ড কলেজ), বর্তমানে - সভাপতি, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।]